Blog

১। পা কামড়ায়ঃ

ক্রনিক ভেনাস ইনসাফিসিয়েন্সির একটা কমন উপসর্গ হল পা কামড়ানো। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে এদের পা ভারী হয়ে যায়, হাঁটুর নিচের মাংশপেশীতে হালকা একটা ব্যথা করে। মনে হয় হাত দিয়ে মাংশপেশীতে চেপে দিলে আরাম লাগবে। জার্নি করলে এদের পা ফুলে যায়, রাতে শোয়ার পর ঠিক হয়ে যায়!

 

২। ঘুমের মধ্যে পায়ের পেশীতে টানঃ

অনেকের ঘুমের মধ্যে পায়ের মাংশপেশীতে হটাৎ টান খায়, এক পেশী আরেক পেশীর উপর উঠে যায়। তখন ঘুম থেকে লাফ দিয়ে উঠতে হয়। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে টানা কয়েকদিন মাংশপেশীতে ব্যথা থাকে। সাধারণ মানুষ ভাবেন, শোয়ার ভঙ্গিমা ঠিক না হওয়ায় কিংবা পানি খাওয়া কম হওয়ায় এমন হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় এটাও ক্রণিক ভেনাস ইনসাফিসিয়েন্সির কারণেই এমন হয়ে থাকে। কিছু নিয়ম কানুন মেনে চললে এ সমস্যা এমনিতেই কমে যায়।

 

৩। ভেনাস আলসার বা দীর্ঘস্থায়ী ঘাঃ

এ রোগে পায়ের পায়ের গোড়ালীর দিকে সাধারণত ঘা হয়। ঘা দিয়ে সব সময় পানির মত বের হয়। সহজে শুকায় না। হাই এ্যান্টিবায়োটিক দিয়েও না। এমনকি দিনের পর দিন ড্রেসিং করলেও না। অথচ কিছুই না করে শুধু পা টানা ১০ দিন উঁচু করে রাখলে এটা কমে যায়। যদিও বিষয়টা বাস্তবে সম্ভব না। আশার কথা হল, এমন রোগীদের জন্য এখন ইব্রাহিম কার্ডিয়াকেই পাওয়া যাচ্ছে ফোর লেয়ার ব্যান্ডেজ। বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি ম্যাজিকের মত কাজ করে এই ব্যান্ডেজ। এই ব্যান্ডেজ মূলত পায়ের পানি কমায়। আর ভেনাস আলসারের মূল কারণ ভেনাস ইনসাফিসিয়েন্সি। ভ্যারিকোস ভেইনের জটিলতায় এ আলসার হয়ে থাকে। ভ্যারিকোস ভেইন অপারেশন করে দিলে আলসার এমনিতেই কমে যায়।

 

৪। ডায়াবেটিক ফুট

ডায়াবেটিক ফুট শব্দটাই আমার কাছে অস্বস্তিকর মনে হয়। কারণ, ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি এবং এ্যাথেরোস্কেলেরোসিস এর কারণে এই রোগ মূলত হয়। মূল কারণ হচ্ছে এ্যাথেরোস্কেলোরোসিস যার কারণে রক্তনালীর গায়ে চর্বি জমে রক্তপ্রবাহ কমে যায় । আর রক্ত প্রবাহ কমে যাওয়া মানেই নিদির্ষ্ট অঙ্গে অক্সিজেন স্বল্পতা। অক্সিজেন কমে গেলেই আলসার হয়, পায়ে গ্যাংরিন হয়। রক্তপ্রবাহ না বাড়িয়ে তাই এমন পায়ে অপারেশন করা উচিত না।

 

৫। পায়ের আঙুলে গ্যাংরিণ?

পায়ের আঙুলে গ্যাংরিন দেখলেই কি আমরা কেটে দিব? অবশ্যই দিবেন। তবে তার আগে দেখে নেয়া উচিত কাটার পর ঘা শুকাবে তো? কারণ, পায়ের রক্তপ্রবাহে কোন বাঁধা থাকলে সে ঘা কোনকালেই শুকাবে না। সেক্ষেত্রে কেটে ফেলার আগে আমরা একটা ডুপ্লেক্স পরীক্ষা করতে পারি। সেখানে ব্লকের কোন ক্লু পাওয়া গেলে আগে তা ঠিক করে নিতে হবে। নয়ত পা কিংবা আঙুল কাটার পর নানা বিপত্তি দেখা দিতে পারে!

 

৬। পায়ে হঠাৎ তীব্র ব্যথা হলেঃ

পায়ে হঠাৎ তীব্র ব্যথা হতে পারে। প্রথমে এ ব্যথা অসহ্য আকারে হয়। আস্তে আস্তে কমে যায়। পা ঠান্ডা হয়ে কালো হয়ে যায়। কখনো কখনো এসব রোগীকে প্যারালাইসিস এর রোগী ভাবা হয়। এক্সরে, এম আর আই করা হয়। অথচ পালসে হাত দিলে দেখা যায় তা অনুপস্থিত। পায়ের হটাৎ কোন ব্যথায় তাই সবার আগে পালস দেখা উচিত। থ্রোম্বো এমবলিজম এর কারণে সাধারণত পায়ে হটাৎ ব্লক হয়ে তীব্র ব্যথা হয়। সঠিক সময় পালস দেখে এসব রোগীদের ভাসকুলার সার্জারীতে পাঠালে অকালে অঙ্গ হানির আশঙ্কা থেকে বাঁচা যায়।

 

৭। পা কেটে দেয়ার পর (এ্যাম্পুটেশন) ঘা শুকাচ্ছে না?

পায়ে পচন ধরলে অর্থোপেডিক্স সার্জনরা প্রায় সময় পা কেটে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু পা কাটার পর দেখা যায় স্টাম্প আবার কালো হচ্ছে। তখন আবার কাটতে হয়। সেখানেও গ্যাংরিন হয়। দিনের পর দিন ড্রেসিং করে তখন সুস্থ করে তুলতে হয়। অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি এ্যাম্পুটেশনের সময় ফগারটি দিয়ে রক্তনালী থেকে জমাটবাধা রক্ত বের করে দিলে এ সমস্যা তেমন হয় না। আমরা ভাসকুলার সার্জনরা এ্যাম্পুটেশন করে দেয়ার সাথে সাথে তাই কাটা অংশ দিয়ে ফগারটি করে রক্তপ্রবাহ নিশ্চিত করে কাটা অংশ সেলাই করে দেই।

 

৮। কিডনি রোগীদের শিরা বিড়ম্বনাঃ

কিডনি ফেইল্যুর রোগীদের হাতের শিরাগুলোই হল লাইফ লাইন। আজকে যিনি কিডনি ফেইল্যুর এর রোগী অচিরেই তার কিডনি ডায়ালাইসিস লাগতে পারে। ফিস্টুলা করেই ডায়ালাইসিস করতে হয়। শুরু থেকেই কিডনি রোগীদের দুই হাতের শিরাগুলো তাই সংরক্ষণ করা উচিত। কব্জি থেকে কুনুই পর্যন্ত শিরাগুলো ব্যবহার না করে শুধু কব্জি থেকে আঙুল পর্যন্ত শিরাগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে।

আরেকটি বিষয় খুব ভালভাব মনে রাখা উচিত। ডায়ালাইসি ক্যাথেটার কিডনি রোগীদের জীবনের জটিলতা বাড়ায় মাত্র। তাই কিডনি ফেইল্যুর এর মাত্রা শেষ ধাপে পৌছার আগেই ফিস্টুলা করে রোগীকে প্রস্তুত করে নেয়া ভাল। কারণে ফিস্টুলা সচল হতেও কমপক্ষে দেড় মাস সময় লাগে। এজন্য রোগীকে খুব ভাল করে কাউন্সেলিং করতে হবে।

 

৯। গভীর শিরায় ব্লক বা ডিভিটিঃ

ডিভিটি রোগীদের চিকিৎসায় বহুদিন থেকে ওয়ারফারিন গ্রুপের ঔষধ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু নিয়ম মেনে এ ঔষধ গ্রহণ খুবই কষ্ট সাধ্য। সেকারণে ভাসকুলার সার্জনরা এ ঔষধের ব্যবহার প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক রিকমেন্ডেশন এখন তাই রিভারক্সাভান। এ ঔষধের কার্যকারিতা চমৎকার। সাইড ইফেকটও অনেক কম। তবে কার্ডিয়াক রিকমেন্ডেশন আনা থাকায় এখনো হার্টের ক্ষেত্রে রিভারক্সাভান ব্যবহার করা হচ্ছেনা।

 

১০। আপনি জানেন কি?

হার্টের যেমন ব্লক হয়, পায়েও তেমনি ব্লক হয়। হার্টে যেমন রিং পরানো হয় বা স্টেন্টিং করা যায় পায়েও তেমনি রিং পরানো যায়। হার্টে যেমন বাইপাস করা যায়, পায়েও তেমনি বাইপাস করে ব্লকজনিত রক্তস্বল্পতা ঠিক করা যায়।

ডাঃ সাকলায়েন রাসেল
সহকারী অধ্যাপক, ভাসকুলার সার্জারে, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক, বারডেম, শাহবাগ, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

clear formPost comment